করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার সহজ পরামর্শ দিলেন ডা. বি চৌধুরী

ঢাকা: নতুন ছোঁয়াচে করোনা ভাইরাস রোগ চীন তো বটেই সারা পৃথিবীতে এটি নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। মাত্র ১৭/১৮ দিনে চীন থেকে ছড়ানো এই ভাইরাস নিয়ে আমাদের দেশে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু হয়নি এটা যেমন সত্য এবং এটাও সত্য চীনের সঙ্গে বিভিন্ন কারণে আমাদের যাতায়াত এবং যোগাযোগ উপেক্ষা করার মতো নয়।

এ ছাড়া, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডে এই ভাইরাস রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্প ধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট, অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

করোনা ভাইরাস নিয়ে তার পরামর্শ:

প্রথমে করোনাভাইরাস কী: করোনাভাইরাস সংক্ষেপে সিওভি। এটি নতুন ভাইরাস। যা মনুষ্য সমাজে আগে কখনো ছিল না। চীনের ইউনান প্রদেশের একটি বাজারে যেখানে বন্য পশু এবং মাছ বিক্রি হতো সেখান থেকেই প্রথম মানুষ সংক্রমণ হয়। এভাবে জন্তু-জানোয়ার থেকে মানুষের দেহে এই নতুন ভাইরাস প্রবেশ করে। তারপর এটা বিদ্যুৎ গতিতে মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে (ছোঁয়াচে রোগ) ছড়িয়ে পড়েছে। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

ইবোলা, এইচআইভি সংক্রমণের মতো এটাও মানব সমাজের ওপর একটি নতুন ভাইরাসের আক্রমণ। এর ফলে এই ভাইরাস ও রোগ সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্রুতগতিতে এর সমাধান খুঁজছে। বর্তমানে চীনের সমস্ত পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সব প্রদেশে এটা এপেডিমিক পর্যায়ে ছড়িয়ে গেছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে।

অন্য দেশে: চীনেই এটা থেমে থাকেনি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এর সংক্রমণ চলছে। দেখা গেছে, চীন থেকে যারা অন্যান্য দেশে গেছেন তাদের মধ্যে এই রোগ দেখা যাচ্ছে। হংকং, তাইপে, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে। এ ছাড়াও ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রে এই রোগী শনাক্ত করা গেছে। সবক্ষেত্রেই যারা সম্প্রতি চীন ঘুরে এসেছেন তাদের মধ্যে এ রোগ ধরা পড়েছে।

গত ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত চীনের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় শনাক্ত করা দুই হাজার রোগীর মধ্যে ৫৬ জন মারা গেছেন (শতকরা ২ দশমিক ৮ ভাগ)। এখনো গুরুতর অসুস্থ ৩০০ জন (শতকরা ১৫ ভাগ) ১৬/১৭ দিনে এই অবস্থা। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক এতে কোনো সন্দেহ নেই।

এর উপসর্গ ও লক্ষণ: করোনাভাইরাস এটি শ্বাসনালি সংক্রমক ভাইরাস। সুতরাং এর গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উপসর্গ হচ্ছে : জ্বর, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট। গুরুতর শ্বাসকষ্ট একটি মারাত্মক উপসর্গ। যার মানে হচ্ছে রোগটি নিউমোনিয়ায় দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে বৃদ্ধ এবং শিশুদের নিউমোনিয়া অত্যন্ত মারাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। শেষ পর্যায়ে লিভার এবং কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে।

চিকিৎসা: এ রোগের এখন পর্যন্ত খুব ভালো চিকিৎসা বের হয়নি। প্রথমত রোগী থেকে সংক্রমণ যাতে না ছড়াতে পারে সেজন্য তাকে আলাদা রাখতে হবে। এর জন্য সংক্রামক হাসপাতালে (ইনফেকশাস হসপিটাল) তাকে ভর্তি করতে হবে। এই হাসপাতালে ছোঁয়াচে রোগের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও সেবক/ সেবিকার মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যে প্রোটিএইচ ইনহিবিটর, যথা লোপেনাভির এবং রেটোনাভির এজেন্ট। (নিউমোনিয়া রোগীদের জন্য) এক্সপেরিমেন্টাল জন্তুদের ওপরে ইন্টারফেরন ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষের ওপর ব্যবহারের ফলাফল এখনো জানা যায়নি এবং এই রোগের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। তবে চেষ্টা শুরু হয়েছে।

রোগ নিরাময়ের চাইতে রোগ প্রতিরোধ সহজ ও সস্তা: এখন পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধের পুরোপুরি ব্যবস্থা সম্পর্কে আমরা জানি না। তবে এটা জানা যায়, মানুষ থেকে মানুষে এ রোগ সংক্রমিত হয়। আমরা এখন এও জানি যার ভিতরে এই জীবাণু প্রবেশ করেছে তার থেকে সুস্থ মানুষের মধ্যে এ জীবাণু প্রবেশ করার পর ১০/১২ দিন পর রোগের উপসর্গ প্রকাশ পায়।

কিন্তু উপসর্গ প্রকাশ করার আগে থেকেই জীবাণু তার ভিতরে প্রবেশ করার কারণে তিনি ছোঁয়াচে হয়ে যান। প্রথম পর্যায়ে তাই তিনি একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে সমাজে বিচরণ করতে পারেন। সাধারণত নিঃশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। তাদের হাঁচি, কাশিতে অজস্র জীবাণু বের হয়।

সুস্থ মানুষ নিঃশ্বাসে অথবা ভেজা চোখের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে। হাতে বা আঙ্গুলে জীবাণু থাকলে তা নাক, চোখ স্পর্শ করার ফলে হাতের মাধ্যমে এ রোগ ছড়াতে পারে দ্রুতগতিতে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সারা দিনে ২০/২৩ বার তার হাত বা আঙ্গুল মুখে, চোখে, নাকে লাগায় প্রতি ঘণ্টায়। সুতরাং জাগ্রত অবস্থায় ১৮ ঘণ্টায় ৩৬০ বার মুখম লে চোখ বা নাকে হাত দেয়।

১. সেই জন্য বার বার হ্যান্ড লোশন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

২. মাস্ক বা মুখোশ পরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে মাস্কের বড় অসুবিধা এতে চোখ ঢেকে রাখা যায় না। মাস্কের আশপাশে ঢিলা থাকে এবং মাস্ক বারবার বদলানো যায় না। এর জন্য বড় এবং টাইট মাস্ক ব্যবহার করা প্রয়োজন।

কোথা থেকে রোগ ছড়ায়: রোগীর বাড়ি থেকে। যেখানে অনেক জনসমাগম হয়।

যেমন : জনসভা, ধর্মীয় সভা, বাচ্চাদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালের আউটডোর, ব্যক্তিগত ও সরকারি সামাজিক আয়োজন। পার্টি সেন্টার পার্ক, সিনেমা হল ইত্যাদি। চীনের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে ইউনান প্রদেশে এসব স্থান সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। গণপরিবহন, উড়োজাহাজ, রেলগাড়ি ইত্যাদি। এগুলো আমাদের মনে রাখতে হবে। এয়ারপোর্ট, সমুদ্রবন্দর, রেল স্টেশন, হাসপাতাল, আউটডোর ইত্যাদি জনবহুল স্থানে স্ক্যান করতে হবে। চীনে ব্যবহৃত জ্বর দেখার স্ক্যানার জোগাড় করতে হবে।

এটা শুধু কপালের কাছে লাগালেই গাণিতিক অক্ষরে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে, যা ভাইরাসের প্রথম উপসর্গ জ্বর। টিভি, রেডিও, সংবাদপত্রকে তাদের যোগ্য ও প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে হবে। কেমন করে আত্মরক্ষা করতে হবে তা শিখিয়ে দিতে হবে। কেউ যেন ভয় না পায় সেটাও দেখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *