যেন থ্রিলার সিরিজ, গিটার বাজিয়ে মাদক ব্যবসায়ীকে ধরলেন ডিবি ইন্সপেক্টর!

লালমনিরহাট: অপরাধীদের বোকা বানিয়ে গ্রেফতার করার বিভিন্ন অভিনব কৌশল আমরা সাধারণত সিনেমা কিংবা থ্রিলার সিরিজে দেখতে পাই। সেইসব দৃশ্যে পুলিশ অফিসারদের বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারন, বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল এবং সাহসিকতা দেখে আমাদের কাছে মনে হয় বাস্তবে এসব কৌশলের প্রয়োগ অসম্ভব!

তবে সিনেমার মতো না হলেও অনেকটাই সেরকম অভিনব কৌশলের আশ্রয় নিতে দেখা গেল লালমনিরহাট ডিবি পুলিশকে। ফলে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে মাদক ব্যবসা করে ধরা না খাওয়া ধুরন্ধর মাদক ব্যবসায়ী ধরাশায়ী হয়ে কৌশলের কাছে বোকা বনে নিজেই ধরা দিল খুব সহজে!

অভিযানে অংশ নেওয়া ডিবি সদস্যরা জানায়, লালমনিরহাট জেলা শহরের জনবহুল এলাকা বিডিআর হাটখোলার চিহ্নিত প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ী হচ্ছে মোস্তাক শেখ (৪২)। প্রায় দশ বছর ধরে গাজা বিক্রি করছে বাড়ি ও দোকানে বসেই। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও একবারও পুলিশের হাতে আটক হতে হয়নি তাকে। স্থানীয়দের মতে প্রতিদিন প্রায় কমপক্ষে দুইশ জনের মতো মাদকসেবী যাওয়া আসা করত তার বাড়ি ও দোকানে।

এলাকার সচেতন লোকজন বিভিন্ন সময়ে তার নাম পুলিশকে জানালেও হাতে নাতে আটক করা সম্ভব হয়নি মাদক ব্যবসায়ী মোস্তাককে । কেননা রাস্তার সাথেই তার বাড়ি ও দোকান থাকায় সে খুব সহজেই দেখতে পেত সবকিছুই। এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মোস্তাককে মাদকসহ গ্রেফতার করতে উদ্যোগ নেন জেলা ডিবি পুলিশের (লালমনিরহাট সদর ও আদিতমারী ) উপজেলা এলাকায় অভিযানের দায়িত্বে থাকা ইন্সপেক্টর রায়হান আলী।

তিনি তার একটি দল নিয়ে শনিবার রাতে অভিযানে বের হন। ইন্সপেক্টর নিজেই মাথায় মাফলার পেঁচিয়ে গলায় বিশালাকার একটি গিটার ঝুলিয়ে সাথে একজন অফিসার নিয়ে নেমে পরেন মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ির রাস্তায় । গিটারে এলোমেলো বাজনার সাথে খাপছাড়া গলায় গান গাইতে থাকেন ঠিক যেন বখে যাওয়া ধনীর দুলালদের মতো । এভাবেই ধীরে ধীরে মাদক ব্যবসায়ী মোস্তাকের বাড়ির সামনে পৌছালে দেখা যায় দুজন মানুষ মোস্তাকের সাথে দেখা করে তার গেট দিয়ে চলে গেল।

কিন্তু মোস্তাক বাসায় না ঢুকে গিটারের বাজনার দিকে নিজেই এগিয়ে যায় । মোস্তাককে দেখে গিটার বাজাতে বাজাতে ইন্সপেক্টর বললেন আছে নাকি মামা? মোস্তাক ইসারায় ঢুকতে বলল বাড়িতে। গিটার নামিয়ে ঢুকে গেলেন তারা। মোস্তাক জানতে চাইলেন এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। এখানে না খেলে সাথে নিয়েও যেতে পারেন। খাওয়ার ইচ্ছে পোষন করলে কোমর থেকে এক পুড়িয়া গাজা বের করে বললেন এক নম্বর জিনিস দাম একশ টাকা। ইন্সপেক্টর বললেন এক পুড়িয়া হবে না তার কাছে যতোগুলো আছে তা বের করতে। এ সময় কিছুটা টের পেয়ে বলেন আর নাই। কথোপকথনের মাঝেই অভিযানের বাকি সদস্যরা ঘিরে ফেলে তার বাড়ি।

এরপর প্রতিবেশীদের সামনেই তল্লাশি চালিয়ে পুরোনো ইলেকট্রিক ফ্যানের ভিতরে লুকিয়ে রাখা দুইশ গ্রাম গাজা উদ্ধার হয়। গাঁজা ও ইয়াবা খাওয়ার বিপুল উপকরণ উদ্ধার হয় । মোস্তাক স্বীকার করে তিনি শুধু গাজা বিক্রি করেন এবং তার বাড়িতে মাজে মাঝে খাওয়ার আসর বসত। যারা আসত তারা কখনও ইয়াবা নিয়ে আসলে তাদের নিরাপদে খাওয়ার জন্য ফয়েল পেপার, পাইপ, কক, সিরিজ ও লাইটার রেখেছেন ।

এবিষয়ে জানতে চাইলে, ইন্সপেক্টর রায়হান আলী বলেন, গোয়েন্দা পুলিশের কাজ হচ্ছে সবসময়ই ব্যতিক্রম ও অভিনব। যুগের সাথে অপরাধীরা কৌশল পরিবর্তন করায় তাদের ধরতে নিত্য নতুন কৌশল প্রয়োগের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, মাদক পরিমাণে কতটুকু উদ্ধার হল সেটা মুখ্য না আমরা একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে ধরেছি যে নিজেই প্রতিদিন দুই শতাধিক মানুষের হাতে মাদক তুলে দিয়ে আসছে। অপরাধের ধরন হিসেবে এই জিনিষগুলো গুরুত্বপূর্ণ! অভিযানের বিষয়ে তিনি আরও বলেন জেলার পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা পিপিএম, বিপিএম যোগদানের পর নতুন কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন ।

সেই নির্দেশ মোতাবেক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং কিছুদিনের মধ্যেই সবকিছু আরও নিয়ন্ত্রণে আসবে যার সুফল সাধারণ মানুষ ভোগ করবে। এদিকে গিটার বাজিয়ে এমন একজন প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীকে আটকের খবরটি নিয়ে শহর জুড়ে হইচই পরেছে । বিশেষ করে মাদকব্যবসায়ীদের কাছে ছদ্মবেশী ডিবি আতংক বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা জানান, ঘোষনা দিয়ে যুদ্ধ করতে আসিনি। শুধু আন্তরিক ভাবে সবাই মিলে দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, জেলার সর্বত্র গোয়েন্দা পুলিশ ডিবিকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে মাঠে নামানো হয়েছে এবং তারা বিভিন্ন বিষয়ে নজরদারি করছে। মাদক থেকে বিভিন্ন অপরাধ দমনে এসব অভিযান চলমান থাকবে। এদিকে ডিবি পুলিশের এমন অভিযান সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *